বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ: আইন, আবেগ এবং ২০২৫-এর বাস্তবতা
ফেসবুক বা ইউটিউব স্ক্রল করতে করতে ইদানীং একটা নিউজ প্রায়ই চোখে পড়ে—‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মামলা’। খবরটা দেখার পর কমেন্ট সেকশনে গেলে দুই ধরনের চরমপন্থী মতবাদ দেখা যায়। একদল বলছে, “মেয়েটা তো স্বেচ্ছায় গেছে, এখন কেন মামলা?” অন্যদল বলছে, “ছেলেটা প্রতারক, ওর ফাঁসি হওয়া উচিত।”
একজন আইনের ছাত্র আর ক্রিমিনোলজির মানুষ হিসেবে আমি যখন এই পুরো বিষয়টাকে দেখি, তখন আমার মাথায় শুধু আবেগ নয়, বরং আইনের শুকনো ধারা আর সমাজের রূঢ় বাস্তবতা দুটোই একসাথে কাজ করে। আজকের ব্লগে এই স্পর্শকাতর ইস্যুটা নিয়ে একটু ইন-ডেপথ আলোচনা করা যাক।
কেন ‘সম্মতি’ থাকলেও সেটা ধর্ষণ হয়?
আমাদের মধ্যে একটা সাধারণ লজিক কাজ করে—ধর্ষণ মানেই তো জোর করা, তাই না? তাহলে কেউ যখন নিজের ইচ্ছায় কারো সাথে সম্পর্কে জড়ায়, সেটাকে কেন ধর্ষণ বলা হবে? এটাকে বড়জোর ‘চুক্তিভঙ্গ’ বা ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলা যেতে পারে।
যুক্তিটা ফেলে দেওয়ার মতো না। কিন্তু এখানে আইনের একটা সূক্ষ্ম প্যাঁচ আছে। আমাদের দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা ধর্ষণের ৫টি সংজ্ঞা দেয়। তার মধ্যে একটা হলো—‘সম্মতি ছাড়া’। এখন এই ‘সম্মতি’ বা ‘Consent’ আসলে কী, সেটা বুঝতে হবে।
পেনাল কোডের ৯০ ধারা বলছে, আপনি যদি কাউকে ভয় দেখিয়ে কিংবা কোনো ‘ভুল ধারণা’ (Misconception of fact) দিয়ে সম্মতি আদায় করেন, তবে আইনের চোখে সেই সম্মতির কোনো মূল্য নেই। ধরুন, একজন পুরুষ একজন নারীকে এমনভাবে বিশ্বাস করালো যে সে তাকে বিয়ে করবেই, এবং সেই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই নারীটি শারীরিক সম্পর্কে রাজি হলেন। কিন্তু পুরুষটির মনে শুরু থেকেই ছিল প্রতারণার ইচ্ছা। আইন তখন ধরে নেয়, এই নারীটি আসলে জেনে-বুঝে সম্মতি দেননি, বরং তাকে একটা মিথ্যা প্রলোভনে ফেলা হয়েছে।
অর্থাৎ, আপনার ‘হ্যাঁ’ যদি কোনো মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে আইন সেটাকে ‘হ্যাঁ’ হিসেবে গণ্য করে না। আর এভাবেই ‘বিয়ের প্রলোভন’ বিষয়টি ধর্ষণের সংজ্ঞায় ঢুকে পড়ে।
মুদ্রার উল্টো পিঠ: অপব্যবহার এবং হ্যারাসমেন্ট
এখন প্রশ্ন আসে, তাহলে কি প্রতিটা ব্রেকাপই ধর্ষণ মামলা হবে? এখানেই সবচেয়ে বড় বিতর্ক। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে কিংবা সামাজিকভাবে চাপে ফেলতে ধর্ষণের মামলা দেওয়া হচ্ছে।
হিসাব করে দেখুন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিক্ষিত মানুষ যখন বছরের পর বছর সম্পর্কে থাকেন, তিনি কি জানেন না যে সম্পর্কের পরিণতি যেকোনো দিকে যেতে পারে? উচ্চ আদালতও বেশ কিছু রায়ে বলেছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পর হুট করে সেটাকে ধর্ষণ বলা যাবে না, যদি না স্পষ্টভাবে শুরুতে প্রতারণার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়। কিন্তু সমস্যা হলো—কার মনে কী আছে বা কার ইনটেনশন কী ছিল, সেটা প্রমাণ করা তো সহজ কথা নয়। এর ফলে অনেক নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হয়।
২০২৫ সালের নতুন মোড়: ৯খ ধারা
এই যে ‘সহিংস ধর্ষণ’ আর ‘সম্মতিতে ঘটা প্রতারণা’—দুটোকে একই পাল্লায় মাপা হচ্ছিল, এই সংকট কাটাতে ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
নতুন প্রবর্তিত ৯খ ধারা অনুযায়ী: যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো ব্যক্তিকে বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তার সম্মতিতে যৌনকর্ম করা হয়েছে, তবে সেটাকে আর সরাসরি ‘ধর্ষণ’ (যাবজ্জীবন সাজার অপরাধ) বলা হবে না। বরং এটিকে আলাদা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে যার সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।
এই পরিবর্তনটা কেন দরকার ছিল? কারণ—
- ভারসাম্য: মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হওয়া ধর্ষণ আর বিয়ের কথা বলে সম্মতি নেওয়া এক জিনিস নয়। আইন এখন এই তফাৎটা বুঝতে পেরেছে।
- সাজা নিশ্চিত করা: ধর্ষণের মামলায় সাজা পাওয়ার হার আমাদের দেশে অত্যন্ত কম কারণ প্রমাণ করা কঠিন। কিন্তু এই নতুন ধারায় অপরাধীদের সাজা দেওয়া আগের চেয়ে সহজ হবে।
- অপব্যবহার রোধ: ঢালাওভাবে ফাঁসি বা যাবজ্জীবনের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার সুযোগ এখন অনেক কমে যাবে।
আমার ভাবনা
অপরাধবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, কোনো আইনই নিখুঁত নয়। তবে ২০২৫-এর এই নতুন সংযোজনটি আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে একটু বেশি বাস্তবমুখী করেছে। বিয়ে মানে আমাদের সমাজে একটা বিশাল সোশ্যাল ভ্যালু, আর সেই আবেগকে পুঁজি করে কেউ যদি নোংরা খেলায় মেতে ওঠে, তার শাস্তি হওয়া অবশ্যই উচিত। কিন্তু সেই শাস্তিটা হতে হবে যৌক্তিক।
একইসাথে আমাদের বুঝতে হবে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের দায়ভার শুধু আইনের ওপর ছেড়ে দিলেই হবে না। সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আর সচেতনতাও জরুরি।
আপনি এই ৭ বছরের সাজার বিধানকে কীভাবে দেখছেন? এটি কি প্রতারণা কমাতে সাহায্য করবে, নাকি অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যাবে? কমেন্ট সেকশনে আপনার যুক্তি শুনতে চাই।
আইন জানুন, নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন।
মারুফ হায়াত এলএলবি, এলএলএম (জাবি), এমএসসি ইন অ্যাপ্লাইড ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ ম্যানেজমেন্ট (চলমান)