একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর। বাংলাদেশের সংবিধানে শিশুদের জন্য বিশেষ বিধান রাখার কথা থাকলেও, বাস্তবিক প্রয়োগে আমরা কতটা সফল? ২০২৪-২৫ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শিশু অধিকার এবং আইনি কাঠামোর একটি চিত্র তুলে ধরা হলো।
১. আইনি ভিত্তি: শিশু আইন, ২০১৩ (Children Act, 2013)
বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রধান ঢাল হলো শিশু আইন, ২০১৩। যা ১৯৭৪ সালের শিশু আইনকে প্রতিস্থাপন করেছে এবং জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের (UNCRC) সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে।
এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো:
- শিশুর সংজ্ঞা: ১৮ বছর পর্যন্ত প্রত্যেককেই ‘শিশু’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
- শিশু আদালত: শিশুদের বিচার সাধারণ আদালতে নয়, বরং বিশেষ শিশু আদালতে হওয়ার বিধান রয়েছে।
- গ্রেপ্তার ও আটক: কোনো শিশুকে হাতকড়া পরানো বা ডাণ্ডাবেড়ি দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। গ্রেপ্তার করা হলেও তাকে সাধারণ হাজতে বা বড় অপরাধীদের সাথে রাখা যাবে না।
২. কিশোর বিচার ব্যবস্থা (Juvenile Justice): অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ
একজন ক্রিমিনোলজিস্ট হিসেবে আমি মনে করি, শিশুর অপরাধকে ‘অপরাধ’ হিসেবে না দেখে ‘বিচ্যুতি’ (Delinquency) হিসেবে দেখা উচিত।
- ডাইভারশন (Diversion): শিশুদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় না নিয়ে পারিবারিক বা সামাজিক আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করা।
- সংশোধন কেন্দ্র (Child Development Centers): জেল নয়, বরং টঙ্গী বা যশোরের মতো শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের মোটিভেশনাল এবং ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা।
৩. বড় চ্যালেঞ্জ: শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ
আইন থাকা সত্ত্বেও আমাদের সামনে দুটি বড় সামাজিক বাধা রয়েছে:
- শিশুশ্রম: অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের কারণে শিশুরা বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কাউকে শ্রমে নিয়োগ নিষিদ্ধ, কিন্তু ইনফরমাল সেক্টরে এর প্রতিফলন কম।
- বাল্যবিবাহ: বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী বিশেষ ক্ষেত্রে ১৮-এর নিচে বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে এবং মানবাধিকার কর্মীদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এই আইনের অপব্যবহার রোধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
৪. ডিজিটাল যুগে শিশু অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তা
বর্তমান সময়ে শিশুরা সাইবার বুলিং এবং পর্নোগ্রাফির সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। অভিভাবকদের সচেতনতা ছাড়া শুধু আইন দিয়ে এই অধিকার রক্ষা করা কঠিন।
৫. ক্রিটিকাল এনালাইসিস: আইনের প্রয়োগ কোথায় আটকে আছে?
আইন আছে, কিন্তু বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক শিশু ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পুলিশের শিশু বিষয়ক কর্মকর্তাদের (Child Welfare Officer) সক্রিয়তা এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তাদের তদারকি বাড়ানো জরুরি।
উপসংহার শিশুর অধিকার রক্ষা করা কোনো দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। আমরা যারা আইন নিয়ে কাজ করি বা সচেতন নাগরিক, আমাদের দায়িত্ব হলো শিশুদের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যেখানে তারা ভয়ের বদলে ভরসায় বড় হতে পারে।
আপনার মতামত জানান: আমাদের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো কি সত্যিই শিশুদের সংশোধন করতে পারছে? নাকি সেখানে গিয়ে তারা আরও বড় অপরাধী হয়ে উঠছে? কমেন্টে আপনার সুচিন্তিত মতামত দিন।