Code of Hammurabi: পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো আইন সম্পূর্ণ ২৮২টি আইনের বাংলা বিশ্লেষণ

Code of Hammurabi: পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো আইন সম্পূর্ণ ২৮২টি আইনের বাংলা বিশ্লেষণ

আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে, যখন পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ এখনো গুহায় বাস করত, তখন একজন রাজা একটা কালো পাথরের স্তম্ভে ২৮২টা আইন খোদাই করে রাখলেন। সেই পাথর আজও প্যারিসের Louvre Museum-এ দাঁড়িয়ে আছে — অক্ষত, অম্লান।

এই পাথরের নাম Code of Hammurabi — পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো লিখিত আইনি দলিল।

আশ্চর্যের বিষয় হলো — এই কোডে এমন অনেক আইন আছে যা আজকের ২০২৬ সালের আইনের চেয়েও বেশি কঠোর, বেশি সুনির্দিষ্ট এবং বেশি ন্যায্য। আজকের এই বিস্তৃত ব্লগে আমরা একে একে দেখব হাম্মুরাবির পুরো ২৮২টা আইনই — কোন আইনে কী বলা ছিল, কেন বলা হয়েছিল এবং বর্তমান সময়ের আইনের সাথে তার সম্পর্ক কেমন।


হাম্মুরাবি কে ছিলেন?

হাম্মুরাবি ছিলেন প্রাচীন ব্যাবিলনের রাজা (বর্তমান ইরাক)। তিনি রাজত্ব করেছিলেন আনুমানিক ১৭৯২ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত — প্রায় ৪২ বছর।

তার শাসনামলে ব্যাবিলন সাম্রাজ্য মেসোপটেমিয়ার (আজকের ইরাক, সিরিয়া, কুয়েত মিলে) প্রায় পুরোটাই দখল করেছিল। তিনি ছিলেন সামরিক, প্রশাসনিক এবং কূটনৈতিক — তিন দিক থেকেই অসাধারণ দক্ষ।

কিন্তু তার সবচেয়ে বড় কীর্তি ছিল — এই আইন সংকলন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সূর্যদেবতা শামাশ (Shamash) তাকে এই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছেন। স্তম্ভের উপরের ভাস্কর্যেও দেখা যায়, শামাশ হাম্মুরাবিকে আইনের প্রতীক রড ও আংটি দিচ্ছেন।


পাথরের স্তম্ভটা দেখতে কেমন?

  • উচ্চতা: প্রায় ২.২৫ মিটার (৭ ফুট ৪ ইঞ্চি)
  • উপাদান: কালো ডায়োরাইট পাথর (Black Diorite)
  • লিপি: কিউনিফর্ম (Cuneiform), আকাদিয়ান ভাষায়
  • মোট লাইন: প্রায় ৪,১৩০ লাইন
  • বর্তমান অবস্থান: প্যারিসের Louvre Museum

স্তম্ভের উপরের অংশে একটা ভাস্কর্য আছে — হাম্মুরাবি দাঁড়িয়ে, আর সূর্যদেবতা শামাশ সিংহাসনে বসে তাকে আইন দিচ্ছেন। এর নিচে পুরো স্তম্ভ জুড়ে ২৮২টা আইন খোদাই করা।


আবিষ্কারের ইতিহাস

১৯০১-০২ সালে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটা দল ইরানের সুসা (Susa) শহরে খনন করতে গিয়ে এই স্তম্ভটা আবিষ্কার করেন। ধারণা করা হয়, ব্যাবিলন থেকে এই স্তম্ভ যুদ্ধের সময় এলামাইট রাজারা নিয়ে গিয়েছিলেন সুসায়।

এই আবিষ্কারের পর পশ্চিমা জগতে রীতিমতো আলোড়ন পড়ে যায়। কারণ এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় — বাইবেলের অনেক আইনের মূল উৎস আসলে এর চেয়েও পুরানো


সমাজের তিন শ্রেণি

হাম্মুরাবির সমাজে মানুষ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। কোডের অনেক আইনে এই শ্রেণিভেদ অনুযায়ী আলাদা শাস্তি ছিল। এটা বুঝে রাখা দরকার, নাহলে অনেক আইন বোঝা যাবে না।

শ্রেণিপরিচয়
Awilumমুক্ত নাগরিক, অভিজাত শ্রেণি (Gentleman)
Mushkenumসাধারণ মুক্ত মানুষ, দরিদ্র (Poor man / Commoner)
Wardumদাস (Slave)

এই বৈষম্য আজকের দৃষ্টিতে অন্যায় — কিন্তু সেই যুগের জন্য এটাই ছিল স্বাভাবিক।


এবার দেখা যাক ২৮২টি আইন

হাম্মুরাবির ২৮২টি আইনকে আমি বিষয় অনুযায়ী ১৪টি বিভাগে ভাগ করে আলোচনা করছি। প্রতিটি আইনের নম্বর ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পাবেন।


১. বিচার ব্যবস্থা ও সাক্ষ্য (আইন ১-৫)

এই অংশটা পুরো কোডের ভিত্তি। এখানেই হাম্মুরাবি দেখিয়েছেন — মিথ্যা সাক্ষ্য বা মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি কতটা কঠোর হতে পারে।

  • আইন ১: কেউ যদি কাউকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ দেয় এবং প্রমাণ করতে না পারে — অভিযোগকারীকে মৃত্যুদণ্ড
  • আইন ২: কেউ যদি যাদুকরীর অভিযোগ আনে — অভিযুক্তকে পবিত্র নদীতে ঝাঁপ দিতে হবে (water ordeal)। ডুবে গেলে অভিযুক্ত দোষী, বেঁচে গেলে অভিযোগকারীকে মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ৩: মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে এবং সেই মামলা যদি প্রাণদণ্ডের হয় — মিথ্যা সাক্ষীকে মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ৪: সাক্ষীকে ঘুষ দিয়ে শস্য বা টাকা দিয়ে প্রভাবিত করলে — অভিযোগকারীই সেই শাস্তি ভোগ করবে।
  • আইন ৫: কোনো বিচারক রায় দেওয়ার পর সেটা পরিবর্তন করলে — তাকে রায়ের পরিমাণের ১২ গুণ জরিমানা ও চিরতরে বিচারকের আসন থেকে অপসারণ

আজকের সমাজে: বাংলাদেশে মিথ্যা মামলার শাস্তি Penal Code 1860-এর Section 211 অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড। হাম্মুরাবির আইনে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড।


২. চুরি ও সম্পত্তি অপরাধ (আইন ৬-২৫)

হাম্মুরাবির আমলে চুরির শাস্তি ছিল ভয়াবহ কঠোর — বিশেষ করে যদি মন্দির বা রাজপ্রাসাদ থেকে চুরি করা হয়।

  • আইন ৬: মন্দির বা প্রাসাদের সম্পত্তি চুরি করলে — চোর ও যে গ্রহণ করেছে দুজনকেই মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ৭: সাক্ষী ও চুক্তিপত্র ছাড়া কারো ছেলে বা দাসের কাছ থেকে কিছু কিনলে — চুরি হিসেবে গণ্য, মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ৮: গরু, ভেড়া, গাধা বা নৌকা চুরি করলে — মন্দির/প্রাসাদ থেকে হলে ৩০ গুণ জরিমানা, সাধারণের কাছ থেকে হলে ১০ গুণ। দিতে না পারলে মৃত্যু।
  • আইন ৯-১৩: হারানো সম্পত্তির বিরোধে কীভাবে সাক্ষী এনে প্রমাণ করতে হবে — বিস্তারিত পদ্ধতি।
  • আইন ১৪: কারো ছোট সন্তান অপহরণ করলে — মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ১৫-১৬: প্রাসাদের দাস বা পলাতক দাসকে আশ্রয় দিলে — মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ১৭: পলাতক দাসকে ধরে মালিকের কাছে ফেরত দিলে — পুরস্কার ২ শেকেল রূপা।
  • আইন ১৮-২০: পলাতক দাস সংক্রান্ত আরো বিধান।
  • আইন ২১: ঘরে সিঁধ কেটে চুরি করলে — সেই ফাটলের সামনেই হত্যা ও সমাধি
  • আইন ২২: ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়লে — মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ২৩: ডাকাতি হয়েছে কিন্তু ডাকাত ধরা পড়েনি — যে শহর/অঞ্চলে ঘটনা ঘটেছে, সেই শহরের গভর্নর ক্ষতিপূরণ দেবে।
  • আইন ২৪: ডাকাতিতে কেউ মারা গেলে — শহর কর্তৃপক্ষ ১ মিনা রূপা দেবে নিহতের পরিবারকে।
  • আইন ২৫: আগুন নেভাতে গিয়ে কেউ যদি বাড়ির মালিকের সম্পত্তি চুরি করে — তাকে সেই আগুনেই ফেলে দেওয়া হবে

লক্ষণীয়: আইন ২৩ অসাধারণ — শহরের প্রশাসনকে ডাকাতির জন্য জবাবদিহি করতে হতো। এটা আধুনিক State Liability Theory এর প্রাথমিক রূপ।


৩. সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তা (আইন ২৬-৪১)

এই অংশটা মূলত Ganger (পদাতিক সৈনিক), Constable (অশ্বারোহী), এবং Tributary (কর প্রদানকারী) এদের নিয়ে।

  • আইন ২৬: রাজার আদেশে যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে অন্যকে পাঠালে — মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ২৭-২৯: যুদ্ধে গেলে তার জমি অন্যকে দিলেও ফিরে এসে ফেরত পাবে। ছেলে ছোট হলে তার মা ১/৩ অংশ পাবে।
  • আইন ৩০-৩১: ৩ বছরের বেশি জমি ফেলে রাখলে — অধিকার হারাবে। ১ বছর হলে ফিরে পাবে।
  • আইন ৩২: যুদ্ধে বন্দী হলে — ব্যবসায়ী মুক্তিপণ দিয়ে ফেরত আনবে। পরিশোধ পরিবার, না পারলে শহরের মন্দির, না পারলে রাজপ্রাসাদ করবে।
  • আইন ৩৩-৩৪: গভর্নর বা ম্যাজিস্ট্রেট সৈনিকের সম্পত্তি দখল বা শোষণ করলে — মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ৩৫-৪১: সৈনিকের benefice (রাজা প্রদত্ত জমি/সম্পত্তি) বিক্রি, বন্ধক, বা বিনিময় করা যাবে না। কেউ কিনলে টাকা ফেরত পাবে না।

আজকের প্রসঙ্গে: বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য Government Servants (Discipline and Appeal) Rules আছে, কিন্তু সম্পত্তি অহস্তান্তরযোগ্যতার এমন কঠোর নিয়ম নেই।


৪. কৃষি, জমি ও সেচ (আইন ৪২-৬৫)

মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা টিকে ছিল টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর সেচ ব্যবস্থার উপর। তাই হাম্মুরাবি কৃষি ও সেচ নিয়ে অনেক বিস্তারিত আইন করেছিলেন।

  • আইন ৪২-৪৪: জমি ইজারা নিয়ে চাষ না করলে — প্রতিবেশীর জমির গড় ফসলের সমান শস্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
  • আইন ৪৫-৪৭: ঝড়ে ফসল নষ্ট হলে — কে ক্ষতি বহন করবে (চাষি, না জমির মালিক) — সেই বিধান।
  • আইন ৪৮: ঋণ নিয়ে চাষ করেছে, কিন্তু ঝড়ে ফসল নষ্ট হলো — সেই বছর পাওনা শোধ করতে হবে না, সুদও দিতে হবে না।
  • আইন ৪৯-৫২: ঋণদাতার সাথে শস্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি ও তার আইনি বিধান।
  • আইন ৫৩-৫৬: সেচের বাঁধ ঠিকমতো না রাখলে — প্রতিবেশীর ফসল নষ্ট হলে পুরো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দিতে না পারলে নিজেকে এবং নিজের সব সম্পদ বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
  • আইন ৫৭-৫৮: রাখাল অনুমতি ছাড়া অন্যের জমিতে ভেড়া চরালে — প্রতি গান (পরিমাপ) জমির জন্য ২০-৬০ গুর শস্য জরিমানা।
  • আইন ৫৯: অন্যের বাগানে গাছ কাটলে — প্রতি গাছের জন্য আধা মিনা রূপা।
  • আইন ৬০-৬৫: বাগান করার জন্য জমি ইজারা — মালিক ও বাগানির ভাগাভাগির বিধান। ৪ বছর বাগান বানিয়ে ৫ম বছর থেকে অর্ধেক করে ভাগ।

চমকপ্রদ: আইন ৫৩-৫৪-তে পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং পার্শ্ববর্তী জমির অধিকারের ধারণা ছিল ৪ হাজার বছর আগেই। আজকের Tort Law-এর “Rylands v. Fletcher” নীতির মূল ধারণা এখানেই।


(মুছে যাওয়া অংশ: আইন ৬৬-৯৯)

স্তম্ভের এই অংশটা পরবর্তী এক রাজা (সম্ভবত এলামাইট বিজেতা) মুছে ফেলেছিলেন নিজের নাম খোদাই করার জন্য। তবে পরে কখনো খোদাই করেননি। ফলে প্রায় ৩৫টি আইন চিরতরে হারিয়ে গেছে।

ধারণা করা হয়, এই অংশে বাড়ি ভাড়া, সম্পত্তির লেনদেন, এবং বণিক ও তার এজেন্টের সম্পর্ক নিয়ে আইন ছিল।


৫. বাণিজ্য ও বণিক-এজেন্ট সম্পর্ক (আইন ১০০-১২৬)

প্রাচীন ব্যাবিলন ছিল বিশ্বের অন্যতম বড় বাণিজ্যকেন্দ্র। তাই Code of Hammurabi-তে বাণিজ্যিক আইন বিপুল পরিমাণে ছিল।

  • আইন ১০০-১০৭: বণিক ও তার এজেন্টের সম্পর্ক। এজেন্ট হিসাব রাখবে, প্রতিটি লেনদেনের সিলমোহরযুক্ত রসিদ থাকবে। প্রতারণা করলে — এজেন্ট ৩ গুণ, বণিক ৬ গুণ ক্ষতিপূরণ দেবে।
  • আইন ১০৮-১১১: মদ ব্যবসায়ী (সাধারণত মহিলা) সংক্রান্ত —
    • মদের দাম শস্যের চেয়ে বেশি নিলে → পানিতে নিক্ষেপ
    • দোকানে ষড়যন্ত্রকারীদের জড়ো হতে দিলে এবং পুলিশকে না জানালে → মৃত্যুদণ্ড
    • কোনো ভিক্ষুণী বা সন্ন্যাসিনী মদের দোকানে গেলে বা খুললে → আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যু
  • আইন ১১২: মালামাল পরিবহনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি গায়েব করে — ৫ গুণ ক্ষতিপূরণ।
  • আইন ১১৩-১১৬: ঋণ আদায় ও জামিনদার সংক্রান্ত। জামিনদারকে অত্যাচার করে মেরে ফেললে — ঋণদাতার ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড।
  • আইন ১১৭: কেউ ঋণ শোধ করতে না পারলে — তার স্ত্রী, ছেলে বা মেয়েকে সর্বোচ্চ ৩ বছর ঋণদাতার কাছে কাজ করতে হবে। তারপর মুক্তি।
  • আইন ১১৮-১১৯: ঋণের বদলে দাস বন্ধক রাখলে — যদি সেই দাসী মালিকের সন্তান জন্ম দিয়ে থাকে, তাহলে মালিককে অবশ্যই তাকে কিনে নিতে হবে।
  • আইন ১২০-১২৬: গুদামজাত করা মাল ও আমানত সংক্রান্ত। সাক্ষী ছাড়া দিলে দাবি গ্রহণযোগ্য না।

আজকের প্রসঙ্গে: হাম্মুরাবির আইন ১১৭ আজকের বাংলাদেশের মহাজনি ব্যবস্থার চেয়েও অগ্রসর ছিল। আজকে মানুষ সারা জীবন ঋণে আটকে থাকে, তখন ৩ বছরের সীমা ছিল।


৬. বিবাহ ও পারিবারিক সম্পর্ক (আইন ১২৭-১৬৪)

এই অংশটা সবচেয়ে বিস্তারিত ও আকর্ষণীয়। হাম্মুরাবির বিবাহ আইন আধুনিক Family Law-এর মূল ভিত্তি।

  • আইন ১২৭: কোনো ভিক্ষুণী বা পরস্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিলে — কপালে ছাপ মেরে দেওয়া হবে।
  • আইন ১২৮: লিখিত চুক্তি ছাড়া বিয়ে — আইনগতভাবে স্ত্রী হিসেবে গণ্য নয়
  • আইন ১২৯: পরকীয়া ধরা পড়লে — দুজনকে বেঁধে পানিতে নিক্ষেপ। তবে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ক্ষমা করতে পারে, রাজাও তখন প্রেমিককে ক্ষমা করতে পারেন।
  • আইন ১৩০: বাগদত্তা মেয়েকে ধর্ষণ করলে — পুরুষের মৃত্যুদণ্ড, মেয়ে নির্দোষ।
  • আইন ১৩১-১৩২: মিথ্যা পরকীয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত। স্ত্রীকে নদীতে ঝাঁপ দিতে হবে নির্দোষিতার প্রমাণ হিসেবে।
  • আইন ১৩৩-১৩৬: যুদ্ধে বন্দী স্বামীর স্ত্রীর অধিকার —
    • বাড়িতে খাবার থাকা সত্ত্বেও অন্য পুরুষের কাছে গেলে → পানিতে নিক্ষেপ
    • বাড়িতে খাবার না থাকলে → অন্য বিয়ে করতে পারবে
    • স্বামী ফিরে এলে → স্ত্রী ফেরত আসবে, কিন্তু সন্তান নতুন স্বামীর সাথে থাকবে
  • আইন ১৩৭-১৪০: বিবাহবিচ্ছেদ ও ক্ষতিপূরণ —
    • সন্তানসহ স্ত্রীকে ত্যাগ করলে → যৌতুক ফেরত + জমি/সম্পদের ব্যবহার + সন্তান লালন-পালনের খরচ
    • সন্তানহীন স্ত্রীকে ত্যাগ করলে → যৌতুকের সমান টাকা + ১ মিনা রূপা (গরিব হলে ১/৩ মিনা)
  • আইন ১৪১-১৪৩: স্ত্রীর ঘরোয়া অপরাধ —
    • অপব্যয় ও স্বামীকে অসম্মান করলে → তালাকযোগ্য, ক্ষতিপূরণ পাবে না
    • স্বামী না দিলে → দাসী হিসেবে থাকতে হবে
  • আইন ১৪২: যদি স্ত্রী বলে “আমি তোমার সাথে থাকব না” — তদন্ত হবে। স্বামী দোষী হলে স্ত্রী যৌতুক নিয়ে বাবার বাড়ি ফিরতে পারবে।
  • আইন ১৪৪-১৪৭: বন্ধ্যা স্ত্রী ও দাসী সংক্রান্ত। ভিক্ষুণী স্ত্রী যদি দাসী দেয় সন্তানের জন্য, তাহলে স্বামী আর উপপত্নী রাখতে পারবে না।
  • আইন ১৪৮-১৪৯: অসুস্থ স্ত্রীর ক্ষেত্রে — দ্বিতীয় বিয়ে করলেও প্রথম স্ত্রীকে ত্যাগ করা যাবে না, আজীবন ভরণপোষণ দিতে হবে।
  • আইন ১৫০: স্বামী যদি সম্পত্তি স্ত্রীর নামে লিখে দেয় — সন্তানরা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। স্ত্রী চাইলে যেকোনো সন্তানকে দিতে পারবে।
  • আইন ১৫১-১৫২: বিয়ের আগের ঋণ — অপরের উপর বর্তাবে না। বিয়ের পরের ঋণ — দুজনে মিলে শোধ করবে।
  • আইন ১৫৩: স্বামীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করলে স্ত্রীকে — শূলে চড়ানো হবে
  • আইন ১৫৪-১৫৮: অজাচার (Incest) —
    • মেয়ের সাথে → শহর থেকে নির্বাসন
    • পুত্রবধূর সাথে → পানিতে নিক্ষেপ
    • মায়ের সাথে → দুজনকেই আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যু
    • সৎমায়ের সাথে → পিতার বাড়ি থেকে বিচ্ছেদ
  • আইন ১৫৯-১৬১: বিবাহচুক্তি ভাঙ্গা —
    • বর প্রতিজ্ঞা ভাঙলে → সব উপহার ও যৌতুক হারাবে
    • কনের পিতা ভাঙলে → সব ফেরত দিতে হবে
    • বন্ধু ষড়যন্ত্র করে কনের পিতাকে ভাঙালে → সেই বন্ধু কনেকে বিয়ে করতে পারবে না
  • আইন ১৬২-১৬৪: স্ত্রীর মৃত্যু সংক্রান্ত —
    • সন্তান থাকলে → যৌতুক সন্তানদের
    • সন্তান না থাকলে → পিতার বাড়ি ফেরত

আইনি দিক: হাম্মুরাবির ১২৮ নম্বর আইনে লিখিত বিবাহ চুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা — এটা আজকের Muslim Family Laws Ordinance 1961 এর কাবিননামার পূর্বসূরি।


৭. উত্তরাধিকার আইন (আইন ১৬৫-১৮৪)

হাম্মুরাবির উত্তরাধিকার আইন বেশ জটিল ও বিস্তারিত। লিঙ্গভেদে, দাম্পত্য সম্পর্কের ধরন অনুযায়ী আলাদা বিধান।

  • আইন ১৬৫: পিতা প্রিয় পুত্রকে জীবদ্দশায় বিশেষ উপহার দিতে পারবেন (লিখিত দলিলে)। মৃত্যুর পর অন্য সন্তানরা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না।
  • আইন ১৬৬: পিতার মৃত্যুর সময় অবিবাহিত পুত্রের জন্য — অন্য ভাইরা মিলে যৌতুকের অর্থ আলাদা রাখবে।
  • আইন ১৬৭: প্রথম স্ত্রীর সন্তান ও দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান — মায়ের যৌতুক আলাদা পাবে, কিন্তু পিতার সম্পত্তি সমান ভাগ পাবে।
  • আইন ১৬৮-১৬৯: পুত্রকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইলে — বিচারকের কাছে যেতে হবে। গুরুতর অপরাধ না হলে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রথম অপরাধ ক্ষমা, দ্বিতীয়বার বঞ্চিত।
  • আইন ১৭০-১৭১: দাসীর সন্তান —
    • পিতা জীবদ্দশায় “আমার পুত্র” স্বীকার করলে → স্ত্রীর সন্তানদের সাথে সমান ভাগ
    • স্বীকার না করলে → মুক্তি পাবে কিন্তু সম্পত্তির ভাগ পাবে না
  • আইন ১৭২-১৭৪: বিধবার পুনর্বিবাহ ও সন্তানের অধিকার সংক্রান্ত। যৌতুক প্রথম স্বামীর সন্তানদের।
  • আইন ১৭৫-১৭৬: দাসের সাথে অভিজাত মেয়ের বিয়ে — সন্তানরা মুক্ত হবে। দাসের মৃত্যুর পর সম্পত্তি অর্ধেক স্ত্রী, অর্ধেক দাসের মালিক পাবে।
  • আইন ১৭৭: শিশু সন্তানসহ বিধবা পুনর্বিবাহ করতে চাইলে — বিচারকের অনুমতি লাগবে। পূর্ব স্বামীর সম্পত্তি সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
  • আইন ১৭৮-১৮২: ভিক্ষুণী, পুরোহিতা, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মহিলাদের সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান।
  • আইন ১৮৩-১৮৪: উপপত্নীর কন্যা সংক্রান্ত —
    • যৌতুক দিয়ে বিয়ে দেওয়া হলে → পিতার সম্পত্তিতে আর অধিকার নেই
    • যৌতুক না দিয়ে রেখে গেলে → ভাইরা যৌতুক দিয়ে বিয়ে দেবে

আজকের প্রেক্ষিতে: বাংলাদেশের Muslim Personal Law (Shariat) Application Act 1937 এ উত্তরাধিকার ভাগ ফরায়েজ অনুসারে। হাম্মুরাবির আইনে নারীর অংশ অপেক্ষাকৃত বেশি ছিল কিছু ক্ষেত্রে।


৮. দত্তক গ্রহণ (আইন ১৮৫-১৯৪)

হাম্মুরাবির দত্তক আইন আজকের তুলনায় অনেক বেশি সংরক্ষিত — বিশেষ করে দত্তক সন্তানের নিরাপত্তা।

  • আইন ১৮৫: জন্মদাতার সম্মতিতে শিশু দত্তক নিলে — তার উপর কারো দাবি থাকবে না।
  • আইন ১৮৬: জন্মদাতা বাবা-মা যদি প্রতিবাদ করে — শিশুকে ফেরত দিতে হবে।
  • আইন ১৮৭: প্রাসাদের কর্মচারী বা ব্রহ্মচারিণীর সন্তান দত্তক নিলে — কেউ দাবি করতে পারবে না।
  • আইন ১৮৮-১৮৯: কারিগর যদি দত্তক নিয়ে নিজের কারিগরি শেখায় — কেউ ফেরত দাবি করতে পারবে না। না শেখালে — ফেরত দিতে হবে।
  • আইন ১৯০: দত্তক সন্তানকে নিজের সন্তানদের সাথে গণ্য না করলে — তাকে আসল বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার অধিকার আছে।
  • আইন ১৯১: দত্তক নেওয়ার পর নিজের সন্তান হলে — দত্তক সন্তানকে বিতাড়িত করা যাবে না। সম্পত্তির ১/৩ অংশ দিয়ে বিদায় করা যাবে।
  • আইন ১৯২-১৯৩: দত্তক সন্তান যদি বলে “তুমি আমার বাবা/মা না” — তার জিভ কেটে নেওয়া হবে। যদি জন্মদাতার বাড়ি খুঁজে চলে যায় — চোখ উপড়ে নেওয়া হবে
  • আইন ১৯৪: ধাত্রী যদি শিশুকে মেরে ফেলে এবং অন্য শিশু দিয়ে চাপা দিতে চায় — তার স্তন কেটে নেওয়া হবে

লক্ষণীয়: এই অংশের শাস্তি আজকের দৃষ্টিতে অমানবিক, কিন্তু সেই যুগে দত্তক সন্তান যেন বিতাড়িত না হয় সেই নিরাপত্তার চিন্তা অনন্য ছিল।


৯. শারীরিক আঘাত ও Lex Talionis (আইন ১৯৫-২১৪)

এই অংশটাই সবচেয়ে বিখ্যাত — “চোখের বদলে চোখ” নীতির আইনি ভিত্তি। এই অংশ থেকেই Lex Talionis শব্দটা বিখ্যাত।

  • আইন ১৯৫: ছেলে বাবাকে আঘাত করলে — তার হাত কেটে ফেলা হবে
  • আইন ১৯৬: এক অভিজাত আরেক অভিজাতের চোখ নষ্ট করলে — তারও চোখ নষ্ট করা হবে
  • আইন ১৯৭: হাড় ভাঙ্গলে — তারও হাড় ভাঙা হবে।
  • আইন ১৯৮: গরিব মানুষের চোখ নষ্ট করলে → ১ মিনা রূপা জরিমানা।
  • আইন ১৯৯: দাসের চোখ নষ্ট করলে → দাসের অর্ধেক মূল্য।
  • আইন ২০০: সমান শ্রেণির কারো দাঁত ফেলে দিলে — তারও দাঁত ফেলে দেওয়া হবে
  • আইন ২০১: গরিব মানুষের দাঁত ফেলে দিলে → ১/৩ মিনা রূপা।
  • আইন ২০২: উচ্চ মর্যাদার মানুষকে আঘাত করলে → জনসমক্ষে ৬০টা চাবুক
  • আইন ২০৩: সমান শ্রেণির অভিজাতকে আঘাত → ১ মিনা রূপা।
  • আইন ২০৪: সমান শ্রেণির গরিবকে আঘাত → ১০ শেকেল রূপা।
  • আইন ২০৫: দাস যদি মুক্ত মানুষকে আঘাত করে — তার কান কেটে নেওয়া হবে
  • আইন ২০৬-২০৮: ঝগড়ায় আঘাতের পরিণাম —
    • মৃত্যু না হলে → ডাক্তারের ফি দেবে
    • অভিজাত মারা গেলে → ১/২ মিনা রূপা
    • গরিব মারা গেলে → ১/৩ মিনা রূপা
  • আইন ২০৯-২১৪: গর্ভবতী নারীকে আঘাত করে গর্ভপাত ঘটালে —
    • অভিজাত নারী → ১০ শেকেল
    • গরিব নারী → ৫ শেকেল
    • দাসী → ২ শেকেল
  • মৃত্যু হলে:
    • অভিজাত নারী → আঘাতকারীর কন্যাকে মৃত্যুদণ্ড (Retaliation)
    • গরিব নারী → ১/২ মিনা
    • দাসী → ১/৩ মিনা

এটাই সেই বিখ্যাত নীতি: “চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত।” এই নীতি পরে বাইবেলে (Exodus 21:24) এবং কোরানে (সূরা মায়েদাহ ৪৫) পুনঃউল্লেখ হয়েছে।

মূল উদ্দেশ্য কিন্তু নিষ্ঠুরতা ছিল না — বরং প্রতিশোধের সীমা টানা। কেউ তোমার একটা আঙুল কাটলে তুমি তার পুরো হাত কাটতে পারবে না — শুধু একটা আঙুলই।


১০. চিকিৎসা পেশা ও দায়বদ্ধতা (আইন ২১৫-২২৫)

এই অংশটা Medical Negligence Law-এর প্রাচীনতম রূপ। হাম্মুরাবির আমলের ডাক্তারদের জবাবদিহিতা আজকের চেয়ে অনেক কঠোর ছিল।

  • আইন ২১৫: ব্রোঞ্জের ছুরি দিয়ে অপারেশন করে অভিজাতকে সারিয়ে তুললে → ১০ শেকেল রূপা ফি
  • আইন ২১৬: গরিবের ক্ষেত্রে → ৫ শেকেল।
  • আইন ২১৭: দাসের ক্ষেত্রে → মালিক দেবে ২ শেকেল।
  • আইন ২১৮: অপারেশনে অভিজাত মারা গেলে বা চোখ নষ্ট হলে — ডাক্তারের হাত কেটে নেওয়া হবে
  • আইন ২১৯: দাস মারা গেলে → সমান মূল্যের দাস ফেরত দিতে হবে।
  • আইন ২২০: দাসের চোখ নষ্ট হলে → দাসের অর্ধেক মূল্য।
  • আইন ২২১-২২৩: হাড়/রোগ সারানোর ফি —
    • অভিজাত → ৫ শেকেল
    • গরিব → ৩ শেকেল
    • দাস → ২ শেকেল
  • আইন ২২৪: গরু/ভেড়ার চিকিৎসায় ফি → ১/৬ শেকেল।
  • আইন ২২৫: পশু চিকিৎসায় ভুল করে মেরে ফেললে → পশুর মূল্যের ১/৪ ক্ষতিপূরণ।

আজকের প্রসঙ্গে: বাংলাদেশে Medical Negligence Act এর অভাব প্রকটভাবে অনুভূত হয়। হাম্মুরাবির আইনে ডাক্তারের ভুলে রোগী মারা গেলে সরাসরি হাত কেটে দিতেন। আজ — বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিছুই হয় না।


১১. নির্মাণ ও বোট পরিচালনা (আইন ২২৬-২৪০)

এই অংশটা Strict Liability বা কঠোর দায়বদ্ধতার মূল ভিত্তি।

দাস চিহ্নিতকরণ (২২৬-২২৭)

  • আইন ২২৬: মালিকের অনুমতি ছাড়া দাসের গায়ে স্থায়ী চিহ্ন (ব্র্যান্ড) দিলে — চিহ্নকারীর হাত কেটে নেওয়া হবে।
  • আইন ২২৭: কেউ চিহ্নকারীকে প্রতারণা করে দাসের গায়ে চিহ্ন দেওয়ালে — প্রতারককে মৃত্যুদণ্ড।

নির্মাতার দায়িত্ব (২২৮-২৩৩)

  • আইন ২২৮: বাড়ি তৈরি করে দিলে — প্রতি সার (পরিমাপ) এর জন্য ২ শেকেল রূপা ফি।
  • আইন ২২৯: বাড়ি ভেঙে পড়ে মালিক মারা গেলে — নির্মাতাকে মৃত্যুদণ্ড
  • আইন ২৩০: মালিকের ছেলে মারা গেলে — নির্মাতার ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড
  • আইন ২৩১: মালিকের দাস মারা গেলে — সমান মূল্যের দাস দিতে হবে।
  • আইন ২৩২: সম্পদ নষ্ট হলে — সব ক্ষতিপূরণ + নিজের খরচে বাড়ি পুনঃনির্মাণ।
  • আইন ২৩৩: দেয়াল মজবুত না হলে যদি ভেঙে পড়ে — নিজের খরচে ঠিক করে দিতে হবে।

বোট চালনা (২৩৪-২৪০)

  • আইন ২৩৪: ৬০ গুর ক্ষমতার বোট বানিয়ে দিলে → ২ শেকেল রূপা।
  • আইন ২৩৫: বোট ভালোভাবে না বানালে এবং একই বছরে নষ্ট হলে → বিনামূল্যে নতুন বানিয়ে দিতে হবে।
  • আইন ২৩৬-২৩৭: ভাড়া করা বোট অযত্নে ডুবালে → বোট ও মালামাল সব ফেরত দিতে হবে।
  • আইন ২৩৮: অন্যের বোট ডুবিয়ে আবার তুলে আনলে → মূল্যের অর্ধেক জরিমানা।
  • আইন ২৩৯: বছরে নৌকা চালক ভাড়া → ৬ গুর শস্য।
  • আইন ২৪০: চলমান বোট স্থির বোটকে ধাক্কা দিয়ে ডুবালে — চলমান বোটের মালিক সব ক্ষতিপূরণ দেবে।

আজকের প্রসঙ্গে: রানা প্লাজা বা স্পেক্ট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসের কথা ভাবুন। হাম্মুরাবির আইনে ভবন মালিক/নির্মাতা সরাসরি মৃত্যুদণ্ড পেতেন। আজ তারা বহাল তবিয়তে।


১২. কৃষি প্রাণী, শ্রমিক ও মজুরি (আইন ২৪১-২৭৭)

এই অংশটা শ্রম আইন ও পশু-সম্পদ আইনের প্রাচীন রূপ।

  • আইন ২৪১: কাজের গরু বন্ধক রাখা যাবে না — জরিমানা ১/৩ মিনা।
  • আইন ২৪২-২৪৩: গরু/দুধেল গাভীর বার্ষিক ভাড়া → ৪ গুর / ৩ গুর শস্য।
  • আইন ২৪৪: ভাড়া করা গরু সিংহে মেরে ফেললে → মালিকের ক্ষতি (মালিকের ঝুঁকি)।
  • আইন ২৪৫-২৪৬: অযত্ন বা প্রহারে গরু মারলে → সমান গরু ফেরত।
  • আইন ২৪৭-২৪৮: গরুর চোখ নষ্ট করলে → অর্ধেক মূল্য। শিং/লেজ কাটলে → ১/৪ মূল্য।
  • আইন ২৪৯: প্রাকৃতিক কারণে গরু মারলে → শপথ করে মুক্ত।
  • আইন ২৫০-২৫২: গুঁতোদানকারী গরু সংক্রান্ত। মালিক জানার পরও না বাঁধলে এবং গরু কাউকে মারলে — অভিজাত হলে ১/২ মিনা, দাস হলে ১/৩ মিনা।
  • আইন ২৫৩-২৫৬: জমিতে শ্রমিক/চাষি নিয়োগ ও তাদের প্রতারণা সংক্রান্ত। বীজ চুরি করলে → হাত কেটে নেওয়া হবে।
  • আইন ২৫৭-২৬১: বার্ষিক মজুরি —
    • শস্য কাটার শ্রমিক → ৮ গুর শস্য
    • ষাঁড়ের চালক → ৬ গুর
    • গরু/ভেড়ার রাখাল → ৮ গুর
  • আইন ২৬২-২৬৭: রাখালের দায়িত্ব ও পশুসম্পদের ক্ষতি। প্রাকৃতিক বিপদ (বজ্রপাত, সিংহ) ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে রাখালকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
  • আইন ২৬৮-২৭৭: বিভিন্ন কাজের দৈনিক ভাড়া —
    • মাড়াই করার ষাঁড় → ২০ কা শস্য
    • মাড়াই করার গাধা → ১০ কা শস্য
    • ষাঁড় + গাড়ি + চালক → ১৮০ কা শস্য
    • শ্রমিক (১ম ৫ মাস) → ৬ শে রূপা
    • শ্রমিক (পরবর্তী ৭ মাস) → ৫ শে রূপা
    • কারিগর/দর্জি/মিস্ত্রি/পাথর কাটিয়ে → ৫ শে রূপা
    • কাঠমিস্ত্রি → ৪ শে রূপা
    • মাঝারি বোট ভাড়া → ৩ শে রূপা
    • দ্রুতগামী বোট → ২.৫ শে রূপা
    • ৬০ গুর বোট → দৈনিক ১/৬ শেকেল

চমকপ্রদ: হাম্মুরাবি প্রথম মজুরি আইন (Minimum Wage Law) চালু করেছিলেন। আজকের বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে যে আন্দোলন — তার ধারণাগত শিকড় এখানেই।


১৩. দাসপ্রথা সংক্রান্ত (আইন ২৭৮-২৮২)

কোডের শেষ ৫টি আইন দাস বিক্রয় সংক্রান্ত।

  • আইন ২৭৮: দাস কেনার পর এক মাসের মধ্যে যদি সে অসুস্থ (bennu রোগ) হয় — বিক্রেতা ফেরত নিয়ে টাকা দিয়ে দিবে।
  • আইন ২৭৯: দাসের ব্যাপারে অন্য কারো দাবি থাকলে — বিক্রেতা সেটা সমাধান করবে।
  • আইন ২৮০: বিদেশ থেকে আনা দাস যদি ব্যাবিলনের নাগরিক হয় — বিনা ক্ষতিপূরণে মুক্ত করতে হবে।
  • আইন ২৮১: বিদেশি দাস হলে — ক্রেতা যা দিয়েছে সেটা ফেরত পাবে, মালিক ফিরে পাবে।
  • আইন ২৮২: দাস যদি বলে “তুমি আমার মালিক নও” — মালিক প্রমাণ করলে দাসের কান কেটে নেওয়া হবে

আইন ২৮০ অসাধারণ: ব্যাবিলনের নাগরিককে যদি কেউ বিদেশে দাস বানিয়ে দেশে এনে বিক্রি করে — তাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। এটা নাগরিকত্বের অধিকারের এক প্রাচীন স্বীকৃতি।


কোডের শেষে কী লেখা ছিল?

হাম্মুরাবি কোডের শেষে নিজের সম্পর্কে একটা এপিলগ (Epilogue) খোদাই করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন —

“আমি হাম্মুরাবি, ন্যায়বিচারের রাজা, যাকে শামাশ আইন দিয়েছেন। আমি দুর্বলকে সবলের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছি। অনাথ ও বিধবার জন্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছি… যে কেউ এই আইন বদলাবে বা মুছে ফেলবে — দেবতারা তাকে অভিশাপ দেবেন।”


কোডের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

হাম্মুরাবির এই কোড পৃথিবীর আইনি ইতিহাসে যা যা প্রভাব ফেলেছে —

  1. লিখিত আইনের ধারণা: প্রথমবারের মতো আইন হয়ে উঠল পাবলিক ও লিখিত — যা জনসাধারণ পড়তে পারে।
  2. সর্বজনীন প্রয়োগের ধারণা: আইন সবার জন্য সমান — এই ধারণা (যদিও বাস্তবে সম্পূর্ণ মানা হয়নি)।
  3. Lex Talionis: “চোখের বদলে চোখ” নীতি — যা পরে তাওরাত (Exodus 21:24) ও কোরানে (সূরা মায়েদাহ ৪৫) পুনরাবৃত্ত।
  4. চুক্তি আইন (Contract Law): লিখিত চুক্তি, সাক্ষী, সিলমোহর — এসবের আইনি গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা।
  5. পেশাদারের জবাবদিহিতা: ডাক্তার, নির্মাতা, রাখাল — সবার নিজ পেশায় ব্যর্থতার জন্য আইনি দায়বদ্ধতা।
  6. পরিবার আইন: বিবাহ, বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক — সবকিছুর কাঠামো।
  7. শ্রম ও মজুরি আইন: ন্যূনতম মজুরির ধারণার প্রাচীনতম রূপ।

আজকের সমাজের সাথে তুলনা

হাম্মুরাবির আমলে যা ছিল, কিন্তু আজকের অনেক দেশের আইনে নেই —

  • নির্মাতার মৃত্যুদণ্ড ভবন ধসে মালিক মরলে
  • ঋণের সর্বোচ্চ ৩ বছরের সীমা
  • মিথ্যা মামলার মৃত্যুদণ্ড
  • ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় হাত কাটা
  • সরকারি কর্মকর্তার বেনিফিট অহস্তান্তরযোগ্যতা
  • পরিবেশগত দায়বদ্ধতা (সেচ ব্যবস্থা)

বাংলাদেশের আইনের সাথে তুলনা করলে — বহু ক্ষেত্রে হাম্মুরাবির ৪ হাজার বছর আগের আইন বেশি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর।


মূল উৎস ও আরো পড়তে চাইলে

এই আর্টিকেলের তথ্যসূত্র:

  1. Yale Avalon Project: https://avalon.law.yale.edu/ancient/hamframe.asp — সম্পূর্ণ ২৮২টি আইনের L.W. King অনুবাদ
  2. Project Gutenberg: https://www.gutenberg.org/files/17150/17150-h/17150-h.htm — C.H.W. Johns এর সম্পূর্ণ অনুবাদ
  3. Louvre Museum: https://www.louvre.fr/en/explore/the-palace/code-of-hammurabi — মূল স্তম্ভের ছবি ও তথ্য
  4. Wikipedia: https://en.wikipedia.org/wiki/Code_of_Hammurabi — সাধারণ ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ

শেষ কথা

হাম্মুরাবির এই কোড পড়লে একটা কথা স্পষ্ট হয় — আইন ও ন্যায়বিচারের ধারণা মানুষের সভ্যতার একদম গোড়ার অংশ। ৪ হাজার বছর আগে যে রাজা তার প্রজাদের জন্য কালো পাথরে আইন খোদাই করে রাখলেন, তিনি আসলে মানবজাতিকে একটা কথা বলে গেলেন —

ক্ষমতাবানও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

আজ আমরা যে আইনি কাঠামোতে বাঁচি — তার বীজ এই পাথরে রোপিত হয়েছিল চার হাজার বছর আগে।

হাম্মুরাবি স্পষ্ট ছিলেন — আইন স্বচ্ছ, লিখিত, এবং সবার জন্য হতে হবে। এই তিনটি শর্ত আজও পূরণ করতে আমাদের অনেক দেশ হিমশিম খাচ্ছে।

ভাবুন তো — এত বছরে আমরা সভ্যতায় কতটা এগিয়েছি, আর আইনে কতটা?


এই আর্টিকেলটি লেখা হয়েছে ব্লগ পোস্ট হিসেবে। তথ্যের নির্ভুলতার জন্য Yale Avalon Project এবং Project Gutenberg এর মূল ইংরেজি অনুবাদ থেকে যাচাই করা হয়েছে।

©Maruf Hayath | blog.marufhayath.com

Avatar photo
Maruf Hayath is a dedicated storyteller and content creator. Over the years, he has built a community of over 145K+ subscribers on YouTube and generated over 100M+ views across platforms. His work revolves around deep-dive documentaries, compelling scriptwriting, and engaging narratives. He believes that every story deserves to be told with authenticity, precision, and emotional resonance.
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *